Saturday, May 16, 2015

মাহমুদ দারবিশ: পাঁজরের ডুমুর আর লাইলাক ফুল কিছু


বুকের পাঁজরে জন্ম নেয় ক্ষোভের ডুমুর! সেই ডুমুর গুড়িয়ে দেবে শত্রুপক্ষের ট্যাংক; ধারালো আগ্রাসন। বলেছিলেন, ‘স্বদেশ, তোমার রাত যেন লাইলাক ফুল, ইঙ্গিতে বাঙ্ময় হয়ে ওঠে।’ প্রেম ও প্রতিবাদের যুগলবন্দি মাহমুদ দারবিশ। যে নামে স্বাধীন দেশ নেই সেই ফিলিস্তিনের জাতীয় কবি। পাখির উদ্বাস্তু হাহাকার। সব কিছুর আগে ও পরে তিনি ছিলেন উন্নত শির, আমৃত্যু চিরবিদ্রোহী। যিনি কিনা বিদ্রোহ করেছিলেন মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোঁড়া ইসরাইলের বিরুদ্ধে। লিখেছেন ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। বিনীত কণ্ঠে দিয়েছেন দুর্বিনীতের স্লোগান।
হে অখণ্ড সুকঠিন ক্রোধ!
নিত্য করমর্দন চাল-চুলোহীনতা
ক্রোধ আমার হাত
ক্রোধ আমার মুখ
                              —পাঠকের প্রতি
১৯৪১ সালে, আক্কা’র নিকটবর্তী ‘বারওয়া’ গ্রামে জন্ম নেয়া দারবিশ যেন নিজেই একটি ইতিহাস, ফিলিস্তিনের ইতিহাস; ইসরায়েলি আগ্রাসনের কালো অধ্যায়ের প্রকাশ্য দলিল। সাত বছর বয়সে পৈত্রিক গ্রামে হানা দিয়েছিল দখলদার ট্যাংক-বুলডোজার। সেই থেকে তাড়া খাওয়া হরিণের জীবন। উদ্বাস্তু হাহাকার, স্বজনদের রক্তাক্ত লাশ বয়ে বেড়ানোর অসহায় অর্তনাদ। তাই যখন তিনি লেখেন আত্মজীবনী, কবিতা অথবা অন্যকিছু তা অবধারিতভাবে হয়ে ওঠে একটি ভাগ্যাহত জাতির কণ্ঠস্বর— ‘মার্চ মাসে, ত্রিশ বছর পূর্বে— পাঁচ পাঁচটি যুদ্ধের আগে/ উজ্জ্বল কবরের রাশি রাশি ঘাসের ওপর আমার জন্ম/ আমার পিতা তখন ইংরেজের হাতে বন্দি/ মা পোষেন তার শীতার্ত সময়/ ঘাসের ওপর আমার বেড়ে ওঠা।’
মাও সে তুঙ বলেছিলেন, একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের সাথে আরেকটি আন্দোলন জরুরি—সেটি হলো সাংস্কৃতিক আন্দোলন যা কিনা মূল আন্দোলনকে প্রেরণা দেবে, দেবে বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি। ফিলিস্তিনের সংগ্রামী জনতার হয়ে সেই কাজটিই করেছিলেন দারবিশ। কবিতা লেখার দায়ে প্রথমবার গ্রেফতার হন ১৯৬১-তে। তারপর হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘পৌরুষের গান’ শিরোনামের কবিতা পাঠ করার দায়ে ইসরাইলি জায়ানবাদী সরকার আবারো তাকে গ্রেফতার করে। সেটা অবশ্য ৩য় দফা, তার আগে গ্রেফতার হয়েছিলেন আরো একবার। এরপর ১৯৬৭-তে তার বিরুদ্ধে সরাসরি ‘ইসরাইল বিরোধী তৎপরতা’য় জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়। এবারও যথারীতি কারাবাস। এরকম পাঁচ/ছয় বার জেল-জুলুম সহ্য করে শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে দেশ ত্যাগ করেন দারবিশ। প্রথমে পাড়ি জমান মস্কো। সেখান থেকে কায়রো। তারপর দীর্ঘ ২ যুগেরও বেশি সময় ধরে যাযাবরের মতো নির্বাসিত জীবন কাটিয়েছেন আরবসহ পশ্চিমা বিশ্বের অনেক দেশে। ১৯৮২-তে ইসরাইল যখন লেবানন আক্রমণ করে তখন তিনি বৈরুতেই ছিলেন। এত ধ্বংস, এত মৃত্যু, এত দীর্ঘতর নির্বাসন, তবু কোনোদিন ভুলেও কলম থামান নি আরবি সাহিত্যে আধুনিকতার এই পুরোধা কবি। বরং ইস্পাতে শান দেবার মতো করে নিজের স্বাধীনতাকামী বক্তব্য আরো স্পষ্ট ও সহজবোধ্য করে হাজির করেছেন বিশ্ব দরবারে। বলেছেন :

হে অখণ্ড সুকঠিন ক্রোধ! নিত্য করমর্দন চাল-চুলোহীনতা। ক্রোধ আমার হাত। ক্রোধ আমার মুখ!

প্রথম দিকে তার কবিতা ছিল গতানুগতিক। প্রথম কবিতাগ্রন্থ ডানাহীন চড়ুই-এ তাই যে দারবিশকে দেখা যায় তিনি ছিলেন পূর্বসূরিদের ছায়া, মৃদু রাজনৈতিক বক্তব্যকে অনুচ্চ রাখার প্রয়াসী। সেটা ১৯৬০ সালের ঘটনা। কিন্তু পরবর্তীতে তিনিই আবার দিনদিন রাজনীতি-সচেতন হয়ে উঠেন। সম্পাদনা করেন আল কারমান, শো’য়ূন ফিলিস্তিনিয়াহ্, আইকারমিল-এর মতো জনপ্রিয় পত্রিকা। এসব সাহিত্যপত্রিকার কোনো-কোনোটির সার্কুলেশন ছিল প্রায় পঞ্চাশ হাজার! তার কবিতা হয়ে ওঠে স্পষ্টবাদিতার নিদর্শন; অগ্নিস্ফুলিঙ্গ।
11139931_10153234609739581_1823002426_nতোমার রাত্রি—শীতের শেষ রাত্রির পর
জান্তাবাহিনী ব্যাটেলিয়ান মোতায়েন করেছে দূরের পথে
আমার কাঁধে ধ্বসে পড়ছে শ্বেতচন্দ্র
নির্বাক আমি, আমার স্বাধীনতা নির্বাক।
রাতব্যাপী একটি প্রশ্নে বিদ্ধ হতে থাকি :
কে আমি? কী আমার পরিচয়?
                                                 —সাদুমের মেঘ
ফিলিস্তিনের অবিসংবাদিত নেতা ইয়াসির আরাফাত যখন সশস্ত্র উপায়ে ইসরাইলি দখলদারি ঘোচানোর চেষ্টা করছিলেন, তখন সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামের দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন দারবিশ। কিন্তু ১৯৯২ অসলো চুক্তি করে ইয়াসির আরাফাত যখন ইসরাইলের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব স্বীকার করে নেন, তখন এই মাহমুদ দারবিশ-ই বেঁকে বসেছিলেন সর্বাগ্রে। পদত্যাগ করেছিলেন ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ পিএলও-র নির্বাহী কমিটি থেকে। আসলে দারবিশ মানেই মুক্তিপাগল প্রাণ, লাইলাক ফুলের ঘ্রাণ, যে ফুলের ঘ্রাণ সবার কাছে গ্রহণযোগ্য। তার কবিতা এতই জনপ্রিয় ছিল যে ইসরাইলের পাঠ্যক্রমে তার কবিতা অন্তর্ভুক্ত করা না-করা নিয়ে দীর্ঘদিন বিতর্ক হয়েছে দেশটির পার্লামেন্ট নেসেট-এ। এমনকি, শত্রু-দারবিশের কবিতা অন্তর্ভুক্তির দাবিতে ২০০০ সালে ইসরাইলের ডানপন্থি সাংসদরা ‘এমকে’ জোট থেকে পদত্যাগের হুমকিও দিয়েছিল। অবশেষে সেই দাবি মেনে নিয়েছিলেন ইসরাইলের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ইয়োসি সরিদ।
এমনই প্রবল প্রতাপ তার লেখনীর। দীর্ঘ সাড়ে তিন যুগেরও বেশি কাল ধরে যিনি নিরর্থকতার ভার কমাতে চেয়েছেন এতটুকু আলোর উপলক্ষ দিয়ে। তার এই দীর্ঘ কাব্যযাত্রা বহুবর্ণিল। সেই যাত্রাপথকে মোটা দাগে কয়েকটি কালখণ্ডে বিভক্ত করা চলে। এক-একটি পর্যায়ে একেক রকম কবিতা লিখেছেন দারবিশ। তবে ১৯৬৪ সালে জলপাই পাতা  কাব্যগ্রন্থ থেকে তার স্বীয় কাব্য-আলোয় চমকিত হতে থাকে ফিলিস্তিনিরা। তারপর ৬৬ থেকে ৭০ পর্যন্ত লিখেছেন আরো ৪টি কাব্যগ্রন্থ। ফিলিস্তিনি প্রেমিক, শেষরাত্রি, অহংকারী চড়ুইয়ের মৃত্যু এবং ভাঙলো প্রিয়ার ঘুম শিরোনামের এই চারটি কাব্যগ্রন্থে বিধৃত কবিতাগুলোতে ইসরাইলি দখলদারত্ব ও ফিলিস্তিনিদের অবর্ণনীয় কষ্ট ও এক অনিশ্চিত উদ্বাস্তু জীবনের কথা বলা হয়েছে।
11139577_10153234609669581_43774542_n‘উল্লেখ, আমি একজন আরব
নামগোত্রহীন, একটি সহিষ্ণু দেশে
আমার প্রিয় খাদ্য
জলপাই তেল সুগন্ধি লতাপাতা
এবং আমার ঠিকানা—একটি বিচ্ছিন্ন মুরুভূমির গ্রাম
যেখানে কোনো রাস্তার নাম নেই
মানুষগুলো কাজ করে মাঠে ও পাথরখাদে
তারা পছন্দ করে সামাজিকতা
তুমি কি ক্রুদ্ধ হবে?’
                              —পরিচয়পত্র
উনিশ শ’র সাতের দশকে দেশ থেকে নির্বাসিত হলে তার কবিতাও বদলে যায়। এই কালখণ্ডের কবিতাগুলোতে স্বদেশ আর প্রিয়তমা একাকার হয়ে যায়। কবিতা হয়ে ওঠে আরো বেশি প্রাঞ্জল। এই সময় টানাগদ্যের কবিতাসহ নানা ধরনের কবিতা লিখেছেন দারবিশ।
তারা হামলে পড়ে আমার ওপর। বিদ্রোহ করে তোমার আদর্শের। বুঝতে পারি না কী অন্যায় আমার! প্রজাপতি আমার কাঁধে চড়ে বসে, আমাকে দেখে ঝুঁকে পড়ে ফসলের শিষ, উড়ন্ত পাখি নেমে আসে আমার হাতের চেটোয়, এ-ই কি আমার অপরাধ? তোমার আদরের নাম যোসেফ। অথচ তারা আমায় নিক্ষেপ করে কূপে। বাঘকে দায়ী করে তারা। অথচ বাঘ তাদের চেয়ে ঢের দয়ালু।
আমি কি কারো প্রতি কোনো অপরাধ করেছি, যখন বলি : ‘একাদশ তারকা, চাঁদ ও সূর্য আমায় সেজদা করেছে স্বপ্নে’।
—যোসেফের অভিযোগ
আসলে, দারবিশকে কোনো ছাঁচেই ফেলা যায় না। আরবি কবিতার প্রথাগত বাকভঙ্গি, চিত্রকল্প, উপমার রীতিটাকে সমূলে পাল্টে দিয়েছেন দারবিশ। ইহুদিবাদী মিডিয়ার প্রচারণায় ফিলিস্তিনের মুক্তিসংগ্রামকে যখন ধর্মীয় মৌলবাদ হিসেবে চিহ্নিত করার অপচেষ্টা চলছে, তখন দারবিশের কবিতা স্বাধীনচেতা ও আধুনিকতার প্রতীক হয়ে ওঠে। কবিতাকে ধর্মীয় প্রবচনে পর্যবসিত হতে দেন নি দারবিশ। বরং তার কবিতায় দেখা যায় ‘আম-জনতাকে’—যারা কিনা স্বদেশ-বিচ্ছেদে কাতর, পাশের কিংবা দূরের কোনো দেশে শীতের কিংবা কষ্টের রাতে মদের নেশায় নিমজ্জিত, তবু তাদের মন অস্থির প্রেয়সীর উষ্ণ আলিঙ্গনের অপেক্ষায়। এই প্রেয়সী আর কেউ নয়, তার প্রিয় স্বদেশ; ফিলিস্তিন। এরকম অসংখ্য নারী ও মিথের ব্যবহার করেছেন দারবিশ তার পুরো সাহিত্যজীবনে। তবে শেষ দিকে ফিরে গিয়েছিলেন কাব্যনাট্যধর্মী দীর্ঘ কবিতায়। তবে তার ভাষা ও প্রকার বৈশিষ্ট্য ছিল আরো বিষয়ী। জীবন্ত ও কঠিন রূপকল্প ও দার্শনিকতার ভার মুক্ত করে তিনি তার কবিতাকে পৌঁছে দেন আরো বেশি মননশীলতা ও গণমানুষের দ্বারপ্রান্তে।
11160416_10153234609684581_1225364957_nদেখা হলো অন্তিম বিদায়ে : কাষ্ঠখণ্ডে হব গচ্ছিত
উড্ডীন হব হাতে হাতে গণমানুষের, নারীর চোখে
ভেসে উঠব ছবি হয়ে। পতাকায় ঢেকে যাবে সব।
                                            —অন্তিম বিদায়
মূলত সত্তরের দশক থেকেই কবি হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করতে থাকেন দারবিশ। বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হতে থাকে তার কবিতা। পাশাপাশি একটু-আধটু করে লিখতে থাকেন স্মৃতিকথা, প্রবন্ধ আর আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস। আর আশি-নব্বইয়ে এসে দারবিশ আর ফিলিস্তিনি কবিতা সমার্থক হয়ে ওঠে। দুবার বিয়ে করেও সন্তানের মুখ দেখতে পারেন নি দারবিশ। এ যেন তার কাছে ফিলিস্তিনের অনাগত ভবিষ্যতের ঘনঘোর অন্ধকারময়তা। যদিও মুখে বলেছেন, বিবাহিত জীবন নিয়ে কোনো খেদ নেই। তবু যখন বলেন, আমি জন্মাতে চাই হাজার গানের প্রেরণায়/ সাগর ও ছাইয়ের মাঝখানে। পাই নি আমি/ সেই মা, যে জন্ম দিতে সক্ষম।—তখন কবিতা, সংসার আর দেশহীন-দেশ একাকার হয়ে যায়। তেমনি দু’দুবার সাক্ষাৎ মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছিলেন তিনি। ১৯৮৪ সালে প্রথম দফা কোমা থেকে ফিরে এসে বলেছিলেন :

আসলে ঐ সময় আমি স্ফটিক আলোর একখণ্ড শাদা মেঘের ওপর গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলাম।

ভিয়েনার হাসপাতালে কর্তব্যরত ডাক্তাদের ভাষ্যমতে, প্রায় মিনিট দুয়েক তো মৃতই ছিলেন তিনি। মানে, ক্লিনিকালি ডেথ। একইভাবে ১৯৮৮-তেও মৃত্যুকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জীবনের বন্দরে নোঙর করেছিলেন দুরাশার সাথে নিরন্তর যুদ্ধ করা এই মানুষটি। কিন্তু তারপরেও মৃত্যুই হয়তো শেষ কথা। জলপাই বন, মোটা-বালির উদ্যান, ফেনিল সাগর—সমস্ত ভ্রমণ শেষে মৃত্যুই হয়তো অমোঘ সত্য। তাই তো ৯ অগাস্ট ২০০৮, চিরতরে চলে গেলেন ঘুমপ্রিয় এই মানুষটি। তবে তাঁর কবিতা জেগে আছে। আরবের কণ্ঠস্বর হয়ে জেগে থাকবে আরো বহু শতাব্দী। থাকবেন দারবিশ, যিনি বলেছিলেন
যদি পরিণাম হয় ছাইভস্ম, আমার কিংবা শত্রুর
যদি ভূপাতিত হই, তবু হাতে থাকবে উদ্বেলিত পতাকা
সমাধির পরে লেখা হবে—
‘অ-ম-র’
বি: দ্র: এখানে ব্যবহৃত কবিতাংশগুলো বন্ধুপ্রতিম মুনকাসির ফুয়াদ কর্তৃক অনূদিত। আর লেখাটা প্রকাশিত হয়েছিল ভোরের কাগজের সাহিত্য সাময়িকীতে, তখন এর শিরোনাম ছিল পাঁজরের ডুমুর রেখে চলে গেলেন লাইলাক ফুলের কবি

Thursday, March 12, 2015

কবিতা : ঐশী বাণী, ভ্রমণ, নাকি আইডিয়া?

কবিতা আর কিছু না, একটা প্রাচীন স্টেশন, বয়ে চলা ফিনফিনা হাওয়া, যেখানে কেউ গেলে বা না-গেলে তার কিচ্ছু যায় আসে না

কবিতা হীরার তলোয়ার, কাঠের পাঁজরা। মিছরি শব্দটাকে জরুরি মনে করি; দুধারি ছুরি তাই অপ্রিয় অথচ সেই নাছোড়বান্দা বন্ধু যাকে এড়ানো অসম্ভব। যা কিছু অন্যে দেখে না সেই নীলবর্ণ অসুখ দেখি, চোখে শিরিশ কাগজের ঘঁষা কার আর ভাল লাগে? আমাকে মারে যেই জন, বৃষ্টি থেকে বাঁচতে বড়সড় মানকচুর পাতা সেই বাড়িয়ে দেয় মাথার ওপর। তারপরেও বলতে হয় অসুখের কথা, এক ন্যাক্কারজনক গোছানো ভাষায়, প্রলাপও বিক্রি হয়। উহ, ভাল লাগে না, কিন্তু যাব কোথায়? এই হলো কবিতা। আমার শত্রুরাই কেবল আমাকে দিয়ে কবিতা লিখিযে নেয়। রাক্ষস-খোক্কস খেলি। যা মনে হয়, যাকে মনে চায় শায়েস্তা করি, রূপকথাকেও! রূপকথারা মরে না। কিন্তু হীরকরাজার সাথেই আজকাল রাজকুমারীর বড় দহরম-মহরম। অসহায় হতে হতে বাতাসে অসংখ্য বেলুন উড়িয়ে দিই, যদিও করাতকলে কাঠচেরাইয়ের শব্দে আজকাল বিমর্ষ বোধ করি না আমি। আহারে, মাঝখানে একটা রংরাং পাখির আবাস কমলো আর কি! আমি রংরাং পাখি চিনি না, কিন্তু তার কথা লিখি, ভাল লাগে না, তবু লিখি। আমি ম্যাচবাক্স-বাড়ি চিনি, তার ভেতরে কতো বারুদ তার গোপন হিসাব লিখে রাখি; লিখে রাখি খাপখোলা কলমে মনে মনে যাকে খুন করি তার পোট্রেট, সেই মারণাস্ত্রের হয়ে আমাকেই চাইতে হয় ক্ষমা। সামনে গীত, গীতা আর গ্যাড়াকল একাকার। ফুটপাত ধরে হাঁটি আর মফস্বল শহরের গার্লস স্কুল গড়িয়ে-গড়িয়ে আসে, পাশের ব্যালকনিটা লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করে আমারই সামনে। পকেটে একটা নেইলকাটার নিয়ে ঘুরি, যখন-তখন নখ কাটি, তারপরেও বড় হয়ে যায় নখ, আঙুল কাটি; তারপরেও ঈর্ষা মরে না, ওদের নির্বাসন দেই কবিতায়।
কবিতা আর কিছু না, একটা প্রাচীন স্টেশন, বয়ে চলা ফিনফিনা হাওয়া, যেখানে কেউ গেলে বা না-গেলে তার কিচ্ছু যায় আসে না। তাহলে কেন লেখেন? এই প্রশ্ন শুনলে সুনীল গাঙ্গুলী বলতেন, ‘কিছু পারি না বলে লিখি’। আমার অবশ্য লেখালেখির নির্দিষ্ট কোনো কারণ নাই। বড়জোর নিজেকে ফুটবল প্লেয়ার মনে করতে পারি। ছোটবেলায় আমাকে পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে মিশতে দেয়া হতো না। খুব খারাপ লাগতো। মনে হতো সব পানিতে গেলো বিকালে খেলতে না পারায়। কিন্তু আজ মনে হয়, খুব বেশি মিস হয়তো হয় না। কিছুতেই কিছু কমে না, বাড়ে না। সীমা কালবাসী বলে এক ইরানী কবি আছেন, যিনি এখন মার্কিন মুলুকে থাকেন, তার কয়টা লাইন মাথায় ঘোরে। সীমা বলছেন—‘কিছুই ঘটে না। আমি কেন্দ্রীয় উদ্যান ধরে হাঁটি/ সেখানে নেই কিছু, তারপরেই নো-ফ্লাইং জোন/ কেবল গলা গলিয়ে নেমে পড়ে না নিরর্থকতা/ গুলি চলে, রক্ত ঝরে; তবু এখানে ঘটে না কিছুই/ তবু লিখি,/ নিরর্থকতা যাতে আর নিরর্থকতার ভার বাড়াতে না পারে’। যেমনটা বললাম, খেলাটা জরুরী। বোদলেয়ারের রেশ ধরে বলি, মাতাল হও, কবিতা, নারী অথবা সুরা—যা তোমার ইচ্ছা। শুনছিলাম, জসিমউদ্দীনকে লোকে কবি বললে উনি দারূণ খুশি হতেন। আমি কি তেমন? মনে হয়, হ্যাঁ, মনে হয়, না; নিজেরে মনে হয় মনোবৈকল্যের রোগী ও যুগপৎ ডাক্তার। যদিও মৃত্যুর অধিক কোনো শুশ্রষা নাই। তারপরেও লিখি। মাঝে মাঝে মনে হয় কবিতা না লিখলেও চলে, কিন্তু কেনো লিখবো না? কবিতা আর কিছু না, একটা প্রাচীন স্টেশন, বয়ে চলা ফিনফিনা হাওয়া, যেখানে কেউ গেলে বা না-গেলে তার কিচ্ছু যায় আসে না।

The painting about a poem written by a famous sudanese poet , his name is Jamma. He suffered from schizophrenia and died in Kartoum North, Kober Assylum, but he wrote the most beautiful poetry.

কবিতা হলো খুব সচেতনভাবে অবচেতনের সাথে খেলা। ঐশীবাণী বলে কবির কিছু নাই

আমি ঐশীপ্রাপ্তিতে আস্থাশীল নই। কবিতা হলো খুব সচেতনভাবে অবচেতনের সাথে খেলা। ঐশীবাণী বলে কবির কিছু নাই। কবি বচন বর্ষণ করেন, যার স্রষ্টা ও প্রচারক তিনি নিজেই। কবি হওয়া একটা অবস্থা, ‘বিয়িং অর বিকামিং পয়েট’। কবিতা একজন স্নায়ুতীক্ষ্ণ মানুষের নিজস্ব রিয়েলিটির নিরিখে পলকা বোধের সমাবেশ। কবির কাজ ক্রিয়েটিভ রাশগুলোকে সিঙ্ক্রোনাইজ করা। স্বপ্নগ্রস্থ মস্তিস্ক একটা ক্রিয়েটিভ ইঞ্জিন। সেটা সবার আছে; আছে বলেই আমরা সবাই সম্পর্কিত। কখনো কখনো একজন কবি স্বপ্নগ্রস্থ মস্তিস্ক ও ঘটনাপ্রবাহের এডিটিং-এর কাজের মধ্যে ভেদরেখা ভুলে যান। হয়তো এটাকে ঐশীপ্রাপ্ত বলেন অনেকেই। একজন লেখক যখন ঘোরের মধ্যে থাকেন তখনই তিনি সজাগ। এটা একটা বস্তুগত ও সেমিকনসাস অবস্থা। ভাবনার প্রথম কিরণটি যখন উঁকি দিলো তখন যে সিনটাক্স, যে রূপকল্প, যে ক্ষোভ, যে লালসার বর্ণালী—তাকে ক্যাচ করাই হচ্ছে কবির মূল চ্যালেঞ্জ। কারণ একটু সময় পেলে পুরনো পাঠ ও পেছনমুখী অভিজ্ঞতা উদ্বায়ী চিন্তার দুয়ার বন্ধ করে দিতে পারে। তাই দেখা যায় একটি ভাবনা কবিতায় লিপিবদ্ধ হবার পর তাকে আর ঠিক আগের মতো মনে হয় না, অনেকক্ষেত্রে তা হয়ে ওঠে অভিজ্ঞতাজাত দর্শন ও কবিতার পুনর্লিখন, এক সাজানো বাগান; মোঘল আমলের পর থেকে এরকম বাগান অনেক হয়েছে। চিন্তাটাকে ছেড়ে দিলে বরং তা হয়ে উঠতে পারে অরণ্যময়, প্রকৃতিক ও স্পন্দনশীল; ফলতঃ চেতনাপ্রবাহের কাছাকাছি। তাই জাগনা থাকাটা জরুরী, টেকনিকটাও। আর বলা বাহুল্য, স্নায়ুতীক্ষ্ণতা বা আন্দোলিত হওয়ার বিষয়টি এসব কিছুর পূর্বশর্ত।
কতো দগদগে এই সময় অথবা পোষা ইন্দ্রলোক। কিন্তু আমার কোনো দেবযান নেই, লিখতে পারি না কোনো রূপকথা, তবু লোকচুক্ষুর আড়ালে আজো পঙ্খিরাজ ঘোড়া পুষে যায় কেউ। ওরা কেশর ঝাঁকিয়ে সখ্য করে নেয় টাইম মেশিনের সাথে। মাঝেমাঝে এসবে বিহ্বল হয়ে যাই, পকেট থেকে নেইলকাটার বের করে দেখি, উধাও—তার জায়গায় পড়ে আছে চিরকুট। খালি চিরকুটে আঁকিবুকি করতে ক্রেয়ন খুঁজি, পরিরা রোজ রাতে ক্রেয়নের জন্য কান্নাকাটি করে। নূরের চোটে কয়লা হয়ে যাই, তাতে ৩ নম্বর লোকালগুলো থেমে থেমে অনেক দূর অবধি চলে যেতে পারে। এই যেমনি আজ টিকিট কেটে বসে আছি, দূর নক্ষত্রে চলে যায় রেণুভর্তি বসন্তের মালগাড়ি। কিন্তু আমি বর্ষামাশরুমের নীচে ব্যাঙাচিদের রহনসহন তদারকি করি। কবিতা তাই এক আশ্চর্য ভ্রমণ, যেখানে ক্ষুদ্র ধূলিকণাও স্বর্ণমহিমায় উত্তীর্ণ হতে পারে, রাত হয়ে যেতে পারে পরিদের ডাইনিং টেবিল, যেখানে এক দর্জি বালক নিজহাতে গড়ে দেবে প্রেয়সীর বিয়ের পোশাক। বিচ্ছেদ এতাই মধুর শব্দমালায়। সেই সেলাই মেশিনের ঘড়ঘড় কিংবা কবিতার ছন্দ সব এক সুতোয় গাঁথা। কবিতা কখনো ছন্দবর্জিত হতে পারে না, হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, চিন্তা ও বয়ানের একটা তরঙ্গ থাকে, তরঙ্গ মানেই তো ছন্দ; নাকি? বিষয়টা যদি হয় প্রথাগত স্বর, মাত্রা, অক্ষরবৃত্ত; তবে তা বয়ান কৌশলের পার্ট। চিন্তা বা অনুভূতির তরঙ্গই হলো আসল ছন্দ। এটা জরুরি নয় (হয়তো সম্ভবও নয়)—মস্তিষ্কে যে চিন্তাকম্পাঙ্ক, তা প্রথাগত ছন্দ মেনে সৃষ্টি হবে। জোর দিতে চাই, বয়ানে যাতে অনুভূতির কম্পাঙ্ক হুবহু ধরা পড়ে। সেক্ষেত্রে অই বিশেষ কবিতার সৃষ্টিলগ্ন, সেই সময়ে কবির জীবনাচার ও অন্যান্য মনোদৈহিক প্রভাবই নির্ধারণ করে কবিতা কীভাবে উপস্থাপিত হবে। এর ব্যত্যয় কবিতার স্বাভাবিকত্বকে খর্ব করে। তাই ছন্দ সহায়ক নাকি অসহায়ক, এই প্রশ্নই ওঠে না। বরং প্রশ্ন থাকতে পারে, আপনি চিন্তার অনুরণনকে ধরতে বা বয়ান করতে প্রথাগত ছন্দকে কতটুকু প্রাধান্য দেন। উত্তর হবে : ‘ইট ডিপেন্ডস্ …’।

না দর্শন, না নন্দনতত্ত্ব, না ধর্মপ্রচার, কবিতায় আইডিয়া জেনারেট করাটা জরুরি

কবিতাকে কীভাবে দেখি বা লিখি, এর রন্ধনপ্রক্রিয়া কেমন? এখানেই এসে যায় ফখরুদ্দিন বাবুর্চির সাথে মহল্লার বাবুর্চির কাচ্চিবিরানির পার্থক্য। শব্দ ভাষার ক্ষুদ্রতম একক। আমি ভাই মুক্তি দিতে চাই ফুল-পাখিদের, ওরা তো আর ফুল-পাখি নাই, প্লাস্টিক হয়ে গেছে, আর ওইসব সন্নিবেশে কবিতা হয়ে গেছে প্লাস্টিকের চটি, বড় বেশি ক্লিশে, বড় বেশি মনোটোনাস। আর মনোটোনাস ভাষায়, মুখে যা বলি তা কেন লিখি না? ভাষা তো আর এত পলিশ ফার্নিশ না। কত নিত্যনতুন ঝাক্কাশ শব্দ আসছে, এসে গেছে, বুলিতে-গুলিতে কতো কেরফা, কতো অবলীল-সাবলীল ফাউল-টক। আমি ফাউল টকের পক্ষে। তবে, তা ‘আনএডিটেড রাশ অব ক্রিয়েটিভ মাইন্ড’। কতটুকু পারি, সেখানেই আমার বিশেষত্ব, দুর্বলতা, আত্মপরিচয়। মনে হয়, ‘কেওয়াস বা মব পোয়েট্রি’ লিখি। যেটা এক ধরণের হুল্লোড়ি চেতন প্রবাহ। একটা আইডিয়া। কিছুটা এভিল মোটিভসহ সহজাত ম্যাডনেস। দেশে কবিতায় আইডিয়া জেনারেট করার ক্ষেত্রটিতে বড়ই আকাল। তাই না দর্শন, না নন্দনতত্ত্ব, না ধর্মপ্রচার, কবিতায় আইডিয়া জেনারেট করাটা জরুরি।

নোয়াম চমস্কি বলেছিলেন, ”Colorless green ideas sleep furiously.” সত্যিই তো রঙহীন সবুজ বোধ ক্রুদ্ধভাবে ঘুমায়! কবিতা তো সেই আশ্চর্য মিরাকল, যার নাগাল সবাই পায় না। সেই নির্জন ও একাকীতম পথে শুধু নিমগ্ন একাকীত্ব। শোনা যায় “এক হাতে যে তালির জন্ম কেমনতর তার শব্দ?” যার চাবিকাঠি হয়তো থাকে মঙ্গলবারের বর্গাকৃতি শেকড়ে’।
কবিতার বড় শক্তি হলো কথা বা শব্দ। ভাস্কর চক্রবর্তী যেমন বলেছিলেন “কথার মধ্যে রহস্য আছে, তাকে কবিতা বলা যায়”—সেই রকম। ‘শয়নযান’ শিরোনামের যে মোটামুটি বড় প্রবন্ধে ভাস্কর এই কথা বলেছেন, সেই একই প্রবন্ধে ভাস্কর কবিতায় নতুনত্ব আনার ৫ দফা প্রস্তাবনাও দিয়েছিলেন। ১ম দফাতেই তিনি বলছেন কবিতার মতো কবিতা অথবা তথাকথিত কবিতাকে এই মুহূর্তে বাতিল করতে হবে। ২য় দফায় বলছেন : সমস্ত শাঁস থেকে কবিতাকে মুক্ত করতে হবে। স্বাধীন করতে হবে। প্রথাবাহিত কবিতা থেকে সরিয়ে নিতে হবে গয়না। ভাস্কর হয়তো কাটাকাটা সংলাপের কথা বোঝাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বোধকে খণ্ডিত ঝলকানি বানানোর পাশাপাশি আর যা প্রয়োজন তা হলো দর্শন বা শ্লোগানকে আশ্রয় করে, প্রথাগত বাস্তবতাকে স্বীকার করে কবিতার যে উপস্থাপন কৌশল তা সেকেলে হয়ে গেছে। এখন তাই গহনা যেমন জরুরী তেমনি গহনা খোলাটাও।
এই বুদ্ধিবৃত্তিক ও ভিরিক্কিময় বোলচালে চলে আসে কবিতার ব্যাপারে অনাদিকাল থেকে চলে আসা জনবিচ্ছিন্নতার অভিযোগটিও। এপার বাংলায় উনিশ-আশি পরবর্তী কবিতায় এটা প্রবল। এখানে নতুনত্ব ও নিজস্বতা যতটা উচ্চকিত, যতটা উচ্চকিত কবির আমিত্ব, ততটা নিকটে নয় অ্যাভারেজ মানুষের চিন্তা কাঠামো। এটাও সত্যি, কবিতা সবার জন্য নয়, সবার জন্য নিউজপেপার। আবার কিছু ভিউজতো পাঠকদের অনুধাবনসীমায় রাখতে হয়। যেটা ধরে পাঠক আরো দুর্ধর্ষ আবিস্কারে আগ্রহী হবেন। এখন কবিতার পাঠক মনে হয় নিজেরাই—কবিরা; কিছু আছে ‘সাহিত্য করায়’ আগ্রহী নবিশ যশোপ্রার্থী। এর বাইরে কবিতার বই বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়া কিশোর-যুবতীর সংখ্যা মনে হয় কমছে; কমেছে। কিন্তু কবিতা নিত্য। সময়ই ওর বুনন ঠিক করে দেয়। এমন ভাষা আর ঝলমলে শব্দের উলেল চাদর নিয়ে কেউ হয়তো আসবেন তার ভেতর দিয়ে ধ্বনিত হবে সংখ্যাধিক্যের কণ্ঠস্বর—জয় হোক কবিতার।

সবশেষে সেই পুরনো কথা : কবিতা আর কিছু নয়, একটা প্রাচীন স্টেশন, যেখানে কেউ গেলে বা না-গেলে তার কিছু যায় আসে না। মাইরি, কিচ্ছু যায় আসে না।

আয়না ও খোঁপা বাধার কায়দাগুলো

পেনাং-গেনটিং প্যাকেজে যাওয়া হয়নি আমাদের। কিন্তু রোজ বালির সেই নৈশক্লাবে যাচ্ছি
যেখানে এক রাতে স্ফীতদোর বারগার্ল রক্তের বাটিস্যুপ নিয়ে হাজির হয়েছিল
সেখান থেকে যেতে হচ্ছে এমন সব পাহাড়-পর্বত, জ্যোতির্ময় গুহা আর মনোবৈকল্যে ভোগা
বিলাতি রেডিওর কাছে, তাতে আয়না শব্দটি ভুলে যাবার যোগাড়। ফলে হালফ্যাশনের
খোঁপা বাধার কায়দাগুলো দেখার সুযোগ হচ্ছে না খুব একটা। পাচ্ছি না খোঁপা খোলার শব্দও
                                                 পানকৌড়িসমাজে এনিয়ে বিস্তর কানাকানি...


বন্দর

বন্দরের কথা এলেই চলে আসে ক্রন্দনরত তলোয়ার আর হাস্যোজ্জ্বল শিশুর গল্প। আর হুটোপুটি হলে কাচের বয়াম তো ভাঙবেই, ছিঁড়ে যাবে বিনয়ের বোতাম। এখন ছেড়া শার্টে কোন দিকশূন্যপুরে জাহাজ ভাসাবে সারেং? মহাবৃক্ষের ছায়ার মতো ভাবো। ততক্ষণে আমি দূর থেকে চীনা গণিকাটাকে দেখে পিনিক করে নেই। জানোই তো- একটু আধটু আমিষ না হলে পৃথিবী আদতে পোকা খাওয়া একটা সুগোল কমলালেবু। যেমনি রেড-ইন্ডিয়ানরা বলে, একটা কচ্ছপের ওপর আরেকটা কচ্ছপ, তারপর আরেকটা, তার ওপর পৃথিবী... এভাবে গড়ে উঠেছে মোরগফুলের মতো রক্তরাগমিশ্রিত মহাব্রহ্মাণ্ড। যেখানে দ্যুতিবিচ্ছুরণ। কুহকের নদ। নারী। তার হুহু ময়দানে মটরদানা কি সরিষাকণার চেয়েও ক্ষুদ্র যে টিপ- সবুজ- তার মধ্যে আড়াআড়ি শুয়ে থাকে গাছের গুঁড়ি, করাতকল, মাঝারি ট্রাফিক জ্যাম, মানুষের ঝুলন্ত উদ্যান। একদিন এ সবই মিথ্যে হয়ে যাবে। সূর্য কুঁজো হলে সকাল মিথ্যে আর বিকেল মানেই ভাবুকতা। ভাবতে ভাবতে একদিন ম্যাগিলানও বলেছিল, আশলে কেউ ফেরে না শুরুর বিন্দুতে। এমনকি ধবধপে উরু, মেসবাড়ি, চীনা গণিকা, জাহাজ ভাঙার শব্দ। শুধু একটা পরিত্যক্ত ডক ফিরে ফিরে আসে। ডকের ডান পাঁজরে দশভুজার মতো মহাবৃক্ষের অধিষ্ঠান; আর বাম পাঁজরে আকুলিবিকুলি করে বাস্তুচ্যুত মন্থর তারা-কচ্ছপ... ওরা চীনা গণিকা আর বোতাম ছেঁড়া সারেংয়ের হারানো সন্তান।

কুইন আলেজান্দ্রিয়া বার্ডউইং

সাবেক পূর্ব ও পশ্চিম জার্মানির নোম্যানসল্যান্ডে পাখপাখালির যে অভয়ারণ্য গড়ে উঠেছে, সেখান যদি একটি কুইন আলেজান্দ্রিয়া বার্ডউইং ডানা ঝাপটায়, তবে তার প্রভাবে বঙ্গোপসাগর কী সাঙ্গু নদের জলে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় তৈরি হতে পারে।

যদিও ঢেউ আর পাতাম-নৌকা একই কুলবংশের, তবু বৈঠার সাথে ডিম ছাড়তে আসা ইলিশের সম্পর্ক ভালো না। এ জন্য অবশ্য দায়ী জার্মানির অভয়ারণ্যের সেই বার্ডউইং প্রজাপতিটি।

বার্ডউইং জানে, বাতাসে ধনেপাতার গন্ধ না মিশলে কত কত দা
লান চিৎপটাং হয়ে যায়। কত কত জানালা বৌ-বাচ্চা ফেলে রাত করে বেরিয়ে পড়ে অদৃষ্ট হণ্টনে।

পথে কত ছায়াসুন্দর। শ্যামাকঙ্কাল। তবু তীব্র ঠান্ডায় একটা মেরুন হাত আরো ক্ষীণ মেরুন একটা কফিশেকার নিয়ে ঠকঠক কাঁপতে থাকে...

তোমার আমার যৌথ প্রযোজনায় তৈরি হচ্ছে ‘কোল্ড কফি উইথ ভেনিলা আইক্রিম’। সাইক্লোন আইয়ের মতো মহাকালের মধ্যে মিশে যাচ্ছে কতক জাফরানি আর কিছু ইরানি গোলাপের আভা...

তোমার চোখে রঙের হরবোলা, তাও জার্মানির ওই কুইন আলেজান্দ্রিয়া বার্ডউইং প্রজাপতিটির জন্য...

‎ডুবুরি‬

রাজসিক গাম্ভীর্যে যে জাহাজ পরস্ত্রীকে করে দেশান্তরী; বেলেহাস হয়ে ভাসে 
কামসাগরে; তাকেও পাতালপুরির দৈত্ত চু করে টেনে নেয়, তখন বর্ষার 
পোয়াতি মেঘের মতো ডেকের ভেতর আটকা পড়ে অসমাপ্ত সঙ্গম
গৃহকাতর কৃষিবিজ্ঞান, আর ছাপোষা মানুষ। ওদের উদ্ধার করো ডুবুরি!
তারপর চাইলেই তুমি ফিরে যেতে পার বেলেহাসে, কামসাগরে- ওখানে
চেনা নারী, চিনেবাদামের ক্ষেতের পাশে গাজরের হাসি। ছেলেপুলেরা তাই
খরগোশ থেকে যায়। ওদের পাতালপুরের রাজপ্রাসাদের গল্প বলো তুমি
বলো রাজগম্ভীর জাহাজের কথা। কিন্তু জানো কি, প্রতিটি প্রিয় নারীর ভেতর
আড়াআড়ি শুয়ে থাকে ডুবোচর, দেশান্তর আর দেড়শ জাহাজডুবি...



Sunday, October 11, 2009

লেঞ্জা

রাইত ওইলেই এক্কেরে... রাস্তার শেট শাহিনশা দে ধুমাইয়া টান খালি রাস্তায় তুফন ছুটানির পিনিক, ওহন তো বুঝছস্ বছি? কি বোঝো নাই? এই ফুরফুরা পিনিকটার লাইগা ডাইভারীটা ছাড়বার পারলাম না আর কহনো পারমুও না নিজের ঢাকা মেট্রো ক-‘বারো...পায়ত্রিশ...পাচ-পঞ্চাশ’- ট্রাকের স্টিয়ারিংয়ে বসে হেলপার বসিরকে একনাগারে কথাগুলো বলে ফরিদ ড্রাইভার, ওরফে ফরিদ্যা বয়স ত্রিশের কোঠায়, নাক ঈষৎ বোচা, চোখের নিচে খানিক ফোলা পাউরুটি (অতিরিক্ত বাংলা টানার ফল) চোখ দুটোকে মাঝে মাঝে বাংলার নেশা চারানির মতো ছোট করে ঠেলে দেয় অক্ষিকোটরে কিন্তু হাইওয়েতে উঠলে সেই চোখই আবার হায়েনার মেতা জ্বলজ্বল করে মাথার চুলে লাগে দুরন্ত ঘোড়ার কেশরের উদ্দামতা উহু-উ-উহু! বনবন চক্কর মারে পাগলা ঘুড্ডি অর নানীরে খালু, তহন পিনিক কারে কয়! বাতাসের লগে রাইত, রাইতের লগে মিইলা থাকা রোশনাই, আর রোশনাই কামড়াইয়া পইড়া থাকা পিত্তি রঙা রাস্তা; সব মিইল্লা কিমন যে লাগে মাইরী কি সিন-সিনারী! আশুলিয়ার বাইপাস ধরে ধেউর চৌরাস্তার কাছে এসে বেপরয়া মোড় নেয় ফরিদ্যা
—ওই শালা তোর মায়েরে ঠাপাই বাঁইচ্যা গেলি
বামদিকের ট্রাকের জানালার হাতল ধরে নিজেকে সামলে নেয় বসির
—ওস্তাদ, পারলা না হালার সানডে-মানডে কোলোস কইরা দিবার?
প্রথম দিকে বেশ অবাক লাগতো বসিরের—‘এতো কিছু থাকতে ওস্তাদে কেন্ কুত্তার পিছে লাগে? পুলিশ থুইয়া, কুত্তা! পুলিশ রাস্তায় কতো কেরফা করে কাগজপাতি ঠিক থাকলেও মাল চায় সেই পুলিশ থুইয়া, রাস্তার ধার দিয়াও কুত্তা দেখলে পিইষ্যা দিবার চায় কেন্ ওস্তাদ’?
সেইবার ময়মনসিংগের ভালুকা মেলায় ওস্তাদের সাথে পরথম দেখা ওস্তাদ তখন ফুল লোড বাংলা মারছে কয়েক লিটার, অঘরের আখড়ায় মারছে দুই লোটা ভাং এরপর হাতে শুকনার স্টিক গন্ধে মশা-মাছি তফাত ভাগে শরীফ-জমসেদের পাওনা টাকা দিতে না পারায় মেলার মেলা মাইষের সামনে উরাবিস্টি মাইর খাইতাছে বসির ওস্তাদ তখন সিংঘের মুতন হাজির—“কোন খানকির পোলা রে, ওরে ঝাড়ছ কেলা? একলা বইলা? ওই, চুপ! ওর নটিরপুত, কয় লাখ টেকা পাইছ?” বসিরের সাথে সাত জন্মেও পরিচয় নেই ফরিদের বসিরের মনে হয় ফরিদ যেন ফেরেস্তা কড়কড়ি আটটা পাঁচশো টাকার নোট বাতাসে উড়িয়ে দিয়ে বসিরকে বলে— ল, পঙ্খিরাজে উড়াল দেই সেই শুরু আজো পঙ্খিরাজেই ভাসছে বসির আজ বুড়িমারি, কাল সাতকানিয়া, পশশু বেনাপোল—ওর নানীরে খালু, লাইফের পিনিক আর কারে কয়! পতেঙ্গা? না যামু না... বিচে মাল নাই... দিল কি তড়প-তড়প!

একদিন ভয়ে ভয়ে শুধায় বসির
—ওস্তাদ রাস্তায় কুত্তা দেখলেই খেইপ্যা যাও কেন? তোমারে কি কুত্তায় কাটছিলো?
—না সংক্ষিপ্ত উত্তর দেয় ওস্তাদ
বাংলার বতলটা ঠোটে লাগিয়ে বসিয় আবার জিজ্ঞেস করে
—তয়?
—তয় আবার কি?
বতলটা ওস্তাদের হাতে দিয়ে এবার নিজেকে ঠেস দিয়ে বসায় বসির
—না, মানে ওস্তাদ কামড়ায় নাই? তাইলে কি তুমি কুত্তারে কামড় দিবার চাইছিলা, হেই হালার পুত লেঞ্জা তুইল্যা ভাইগ্যা গেছিলো? বলেই জিভ কামড়ায় পড়িমরি পা ধরে
—ওস্তাদ নেশার মালে বইলা ফেলাইছি, ওস্তাদ নেশার মালে... না-না ওস্তাদ মালের নেশায় না না...
ওস্তাদ কি মাই ডিয়ার! ডিপজলের লাহান হোহো কইরা হাসে
—হা হা, ও হো হো, কুত্তারে কামড় দিবার চাইছিলাম! হো হো, কুত্তারে... মুখ দিয়ে পিচিক পিচিক করে বেরিয়ে আসে না গেলা বাংলা মদ
—কি কস্, আরেকবার ক ডরাইছ না আরেকবার ক
ভয়ে ভয়ে বসির বলে—তুমি কুত্তারে কামড় দিবার চাইছিলা, হেই হালার পুত লেঞ্জা তুইল্যা ভাইগ্যা গেছিলো?
ফরিদ হাসে হো হো হো-‘আরেকবার ক’
গামছা দিয়ে লেজ বানিয়ে কিছুটা অভিনয় করে দেখায় বসির ওস্তাদ আরো হাসে

***
উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরে খালি প্লটের ওপর বিরাট বালির আড়ত এখানেই মকাম মালিকরা বালি আনে তুরাগ থেেেক, ভালুকা থেকে ফরিদ বালি আনে ট্রাক ভরে সেই বালিতে গড়ে ওঠে বড় বড় দালান দশটার পর ট্রাকগুলো ঢাকায় ঢোকার অনুমতি পেলে বেড়ে যায় ট্রিপের তোড়জোড় অবশ্য ভেতর দিয়ে কামারপাড়া হয়ে দিনের বেলাতেও বালি আনা যায় তবে ওতে চেকপয়েন্টে গুনতে হয় বাড়তি কড়ি খুব জরুরী ওডার না থাকলে সে পথে পা বাড়ায় না বালি ব্যবসায়ীরা মধ্যরাতে শেষ ট্রিপটা আনার পর বিরাট অবসর পায় ট্রাক ড্রাইভাররা এরপর খায়-দায়, গোল হয়ে ফুর্তি-ফার্তি করে দারু-সারু চলে টহল পুলিশরা দেখেও দেখে না

বালির মকামের কয়েকশো গজ পশ্চিমে একটা ময়লার ডাস্টবিন উত্তরার সবখান থেকে বাসাবাড়ির ময়লা এনে জড়ো করা হয় এখানে তারপর ময়লার গাড়িতে করে নিয়ে ফেলা হয় মুগদাপাড়ার ভাগাড়ে কোনো কোনো দিন পশ্চিম দিক থেকে বাতাস প্রবাহিত হলে, ময়লার গন্ধে টেকা দায় এরসাথে আছে ভাংড়ি-দোকনের দিড়িম দিড়িম শব্দ তবু সব মিলিয়ে ভালই চলে যাচ্ছে বসিরের কেবল দেশের বড় বড় নেতাদের হোগা মারা অবস্থা হাসিনা কট, খালেদা জব-বন এরশাদের জিবলা হান্দায়া পড়ছে ইন্দুরে গর্তে রাতে ট্রকের বালির ওপর তিরপাল পেতে তার ওপরে ভাদ্র মাসের আকাশ দেখতে দেখতে বসির জিজ্ঞেস করে
—ওস্তাদ সব নেতাগো সোনা যে নেতায় যাইতেছে, কি ওইবো?
—কি আর ওইবো? এতো দিন দেশের হোগা মাইরা মজা লুটছে? এহোন দেহো শালারা, লাল দালানের মজা! সব হালারে ফাঁস দিয়া মারা উচিৎ হালারা দেশের মাইনষেরে কুত্তা বানায়া ফেলাইছিলো
—ওস্তাদ হেই বইলাই কি কুত্তা দেখলে চাপা দিবার চাও?
—আরে না, কুত্তার কোনো মা-বইন নাই
ফরিদ ড্রাইভারের গোল্ডস্টার সিগারেটের ফিল্টারে আগুনের শেষ প্রজ্জ্বলনটা আরো তীব্রতর হয় অনেকন কোনো কথা বলে না ফরিদ এমনই এই ঠাওর হয়, এই আর বাও মেলে না এইতো সেদিন বালুর মাঠে যাত্রা দেখতে গিয়ে কি কান্ডটাই না করলো খোদ ঢাকায় যাত্রার এমন রমরমা আয়োজন কেবল বালুর মাঠেই সম্ভব তা যাই হোক যাত্রায় সেদিন কালজলতার পালা এরপর ফিলিমের গান আরোপরে, রাত বাড়ার সাথে সাথে কেবল ঝাকানাকা প্রিন্সেসদের হোগায় সে কি ঢেউ! পদ্মা, তুরাগ, নাফ-কপতা-বুড়িগঙ্গা! ওস্তাদ তখন ফুরফুরা মেজাজে মুখে লালমিয়ার দোকানের মিষ্টি দেয়া ডবল-পান, হাতে বেনসন ‘লুঙ্গিটারে ইকটু কায়দা কইরা ধইরা’— পিছনের ঘরটায় বসিরকে নিয়ে ঢুকে পড়ে ফরিদ প্রিন্সেস শেফালী আঙুল মটকায় আর মুখে চুক্ষার মতো শব্দ করে
—এতো দিনে মনে পড়লো? কয়দিন হইলে তো চইলেই গেছিলাম পেরায়
ফরিদ তখন ভিন্ন জগতে বলে
—ডাল্লিং, আমার ছুডো ভাই, স্বরো-স্বরা শিহে নাই ইট্টু লেখাপড়া শিখাইয়া দিও
গুরুর কথা শুনে মনে বিলাই ফাল দেয় বসিরের একই সাথে শরমে মাথা চৌদ্দ হাত মাটিতে সেঁধায় আর কি ওস্তাদ এমনি পাবলিক কঠিন এক কথায় ওস্তাদ একখান জিনিস; মাল; মেডিন চায়না বাংলাদেশে হয় না তবু, আধো বুলিতে বসির বলে-
—ওস্তাদ ও-স্তা-দ!
—কি রে, তুইও কি নেতা নাকি? আর্মির ডরে নেতায়া পড়ছোস
—ওস্তাদ!
ফরিদ, বসির এমন কি প্রিন্সেস শেফালীও হাসে খিল খিল করে
এমন প্রানখোলা ওস্তাদের মনে আছে এক চোরা দুঃখ “ওস্তাদ, ভাবীর ফোন ধরো না কেন? কও ওহন না সামনে মাসে বাড়ি যাইবা; কইয়া দিলেই তো পারো”-- বসির যতই বোঝায় ফরিদ ততই খিস্তি ঝাড়ে-
—ওই চোদানী মাগি ছুডো ভাইটার মাথা চিবাইয়া খাইতাছে
একটুপরেই করে আক্ষেপ—“আপন ভাই আমার! মায়ের পেটের ভাই!”
পরনে বলে—কি করবো বেচারা বেডি, আমি বাড়ি থাহি না, হাজার হৌক যুয়ানকী বয়স
বসির বিষ্ময় মানে
—কি কও ওস্তাদ, তোমার মাথার বল্টু খুইলা পড়ছে নাকি?
—নারে বল্টু খুলে নাই টাইট দিতাছি
মাঝে মাঝে বসির এক মনে ভাবে—তয় একখান কথা, ভাবীরে ওস্তাদ বহুদ মায়া করে ছুডোবেলা বেনাপল থেইক্যা ভাগায়া আনছিলো তো ভাবীর বাপেরা আছিলো-কঠিন টেরর, খবর পাইয়া পুলিশরে দিয়া রাস্তা বলক দিছে তার ভিতরে দিয়াই টেরাক নিয়া পালাইয়া আইসে ওস্তাদ মাওয়া ফেরিঘাট ধইরা, একটানে নরসিংদি পূবাইল-চর লগেলগে কাজি ডাইক্যা নিকা ধর তক্তা হান্দা পেরেক!

***
আগস্ট মাসের শেষ দিয়া তখন কাজ কাম তেমন নাই ওই দিন, দিনভোর পুলিশ-আর্মির লগে পাবলিক কঠিন ফাইট দিতাছে ভাইংগা একফাই কইরা ফালাইছে পোরাপাইনরা এর ভিত্রে দুলারী ভাবী ফোন কইরা কাঁনলো খুব ভারীর এক কথা—তুমি মাফ কইরা দেও আমারে! বসির দেখে ওস্তাদও চোখ মুছে জামায় এরপরই ফরিদের বেরা চাপলো— নরসিংদি যাইবো বসির যতোই বোঝায় দেশে কার্ফু, আর্মি দেখলেই গুলি করবো, ওস্তাদ বোঝে না বলে,
—তুই বেশি বোঝেস? ভাঙ্গাভাঙ্গি আমরা করছি নাকি? আমাগোরে আটকাইবো কেন? আমরা কি নেতা নাকি? না ছাত্র? খালি টঙ্গী ব্রিজ পারোইলে কাম শ্যাষ...
শেষে ট্রাক নিয়ে ভিতর দিয়ে আব্দুল্লাহপুর ধরে টঙ্গি ব্রিজের কাছে এসে একটা চেকপয়েন্টে থেমে যায় ‘ঢাকা মেট্রো ক-‘বারো, পায়ত্রিশ, পাচ-পঞ্চাশ’ কোনো কথা শোনার আগে ওস্তাদ লুটিয়ে পড়ে মাটিতে ওই তো মাত্র কয়েক গজ দরে টঙ্গী ব্রিজ! ওইটা ঢাকার বাইর ওইখানে কার্ফু নাই বেয়নেটের গুতায় ছিলে যায় কনুইয়ের মাংস ফরিদ মিনতি করে—স্যার আমার বৌ ওসুস্থ, যাইতে দেন কিন্তু কে শোনে কার কথা মারের পর নিলডাউন করে পুরো রাত কাটাতে হয় দুই ওস্তাদ সাগরেদকে পরদিন বিকাল বেলা কার্ফু শিথিল হলে ছাড়া পায় তারা মনে হয় কতো কাল কথা বলেনি, অথচ বলার কিছু নেই কারোর মহাকালের নীরবতা ভাঙে বসিরের কথায়-
—তামারে বলছিলাম না ওস্তাদ, কার্ফু! কার্ফু কইলাম, শুনলা না কইলা এইডা অন্য সরকার ওহন বুঝো ঠেলা!
—হ, কার্ফু, এতটুকু বলে স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে স্কেলেটারে চাপ দেয় কনুইছিলা ফরিদ টঙ্গী স্টেশন রোড পেরিয়ে চেরাগালী; বোর্ডবাজার পেরিয়ে নরসিংদি রোডের দিকে না গিয়ে ট্রাক মায়মানসিংয়ের দিকে যেতে থাকলে বসির হাহা করে ওঠে
—কি করো ওস্তাদ, নরসিংদির রাস্তা তো থুইয়া আইলা; ওই দিকে
—জানি
—তাইলে?
—তাইলে; কি? নরসিংদি যামু না
বসির আকাশ থেকে পড়ে এত পেদানি খাওয়ার পর বস্ এগুলান্ কি বলে? ভাবীর লটরপটর কেচ্ছা শুনতে শুনতে, তার রুপের বর্ননা শুনতে শুনতে কেমন যেন তাকে দেখার লোভ ধরেছিল মনে সেই আশার তবে বাঙ্গি-ফটাস! নিজেকে সংযত করে নিবিষ্ট ড্রাইভিং সিটের দিকে তাকিয়ে সাগরেদ বলে
—বস্, ভাবী তুমার লাইগা ওয়েট কইরা বইসা থাকবো
— নারে, থাকবো না কিছু বদলায় না কহনো
বসির কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তখনই হেডলাইটের আলোয় একটা কালো কুকুরের মুখ ভেসে ওঠে রাস্তায় মাত্র একশ’ গজের মতো দূরত্ব ফরিদ দাঁত কিড়মিড় করতে করতে স্কেলেটারে আরো জোরে পা দাবায়
—শালা কুত্তার লেঞ্জা তেরাই থাকে কুত্তার লাইফে ঘিনঘিন করে রে বছি...
খারা! অহনি পিইষ্যা দিতাছি